মোঃ হোসাইন আহমেদ তাড়াশ প্রতিনিধি।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের মাটির তৈরী তৈজস পত্র ব্যবহারের ঐতিহ্য। প্রতিবার বৈশাখ এসে আমাদের মনে করিয়ে দেয় মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার ফ্যাশন নয় বরং ঐতিহ্য। একসময় আমাদের গ্রামবাংলায়, এমনকি শহরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ব্যবহার করা হতো মাটির থালা, গ্লাস, কলস, পানির জগ, মটকা, হাঁড়ি ইত্যাদি। সভ্যতার উন্নতির কারণে ঘরোয়াভাবে মাটির পাত্র এখন তেমন একটা ব্যবহার হয় না। মাটির পাত্রের স্থানে জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিক, মেলামাইন, এলুমিনিয়াম, সিরামিকের তৈজসপত্র।
মাটি দিয়ে তৈরী করা হয় এমন শিল্প কে বলে মৃৎশিল্প । মৃৎ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্তিকা বা মাটি আর ‘শিল্প’ বলতে বোঝানো হয় সুন্দর ও সৃষ্টিশীল বস্তুকে। তাই মাটি দিয়ে তৈরি সব শিল্পকর্ম মৃৎশিল্প হিসেবে পরিচিত। ইংরেজিতে মৃৎশিল্পকে সাধারণত ‘পটারি’ বা ‘সিরামিক আর্ট’ নামে অভিহিত করা হয়। এই শিল্পকর্মের কারিগর যারা, সেই শিল্পীদের বলা হয় কুমার।সর্বপ্রথম চীনের থাংশান শহরে মৃৎশিল্পের জন্ম হয়। আর এ কারণে এ শহরটিকে মৃৎশিল্পের শহর বলা হয়। চীনের পেইচিং শহর থেকে ১৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এই শহরের অবস্থান। এখানকার পথে-প্রান্তরে, পর্যটনকেন্দ্র ও পার্কগুলোতে মৃৎশিল্পের নানা শিল্পকর্ম দেখতে পাওয়া যায়।
মাটির তৈজসপত্রের ইতিহাস মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। প্রত্নতত্ত্ববিদ জেমস্ মেলার্ট তুরস্কের আনাতোলিয়া উপত্যকা খনন করে ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে নানান ধরনের মাটির পাত্র উদ্ধার করেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অনুমান করা হয়, পাত্রগুলো কমপক্ষে ৯ হাজার বছর আগের তৈরি। খ্রিস্টপূর্ব সাড়ে ছয় হাজার অব্দে আরও উন্নত মানের হাতে তৈরি, পোড়ানো এবং রং করা মৃৎপাত্রও একই জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর অঞ্চলে মাটি খুঁড়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার লিওনার্দ উলে তিন হাজার বছর আগের তৈরি মাটির তৈজস আবিষ্কার করেন।
১৯২২ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত বাঙালি ঐতিহাসিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও লেখক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ননীগোপাল মজুমদার সিন্ধু ও পাঞ্জাব প্রদেশে মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করেন মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতা। এর ধ্বংসাবশেষ থেকেও মৃৎশিল্পের অনেক নমুনা পাওয়া গেছে। সেগুলোর মধ্যে তৈজসপত্রও ছিল। বেলুচিস্তানের কোয়েটা, মাল ও কুল্লিতে পাওয়া গেছে মেটে রঙের নানা ধরনের মৃৎপাত্র।
মৌর্য, কুষাণ ও গুপ্ত যুগের বিভিন্ন মৃৎপাত্রের নমুনা পাওয়া গেছে মাটি খুঁড়ে। এসব মৃৎশিল্পের মাধ্যমে সে যুগের মানুষের জীবন-যাপনের ইতিহাস জানা সম্ভব হয়েছে। বৈদিক যুগে প্রতিমা পূজার প্রথা ছিল, এ কারণে তখনকার পোড়ামাটির অনেক প্রতিমা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে মৃৎপাত্রের ধারাবাহিকতা ও বিকাশ ওই ঐতিহ্যেরই ফল বলে মনে করা হয়।
গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা ও মধ্যভারতজুড়ে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে দ্বিতীয়-তৃতীয় খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পোড়ামাটির যে শিল্পধারা গড়ে উঠেছিল মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর, পোখরান, তমলুক, মেদিনীপুর, বর্ধমান, হুগলি, বীরভূম প্রভৃতি এলাকায়; আবিষ্কৃত প্রাচীন পোড়ামাটির ফলকে তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন ধরা পড়ে। উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জায়গার মধ্যে দিনাজপুর জেলার সীতাকোট বিহার, রংপুর জেলার বোগদহ, সিরাজগঞ্জ জেলার তারাস থানার নিমগাছি, রাজশাহীর বিজয়নগর, নওগাঁর ধামইরহাট, বগুড়ার ক্ষেতলাল, নীলফামারীর ধর্মপালগড়েও একই ধরনের শিল্পকর্ম পাওয়া গেছে। এসব মৃৎশিল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তৈজসপত্র। ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলার উয়ারী ও বটেশ্বরে পোড়ামাটির শিল্পকর্মের মধ্যে মিলেছে মৃৎপাত্র। এগুলো বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে উত্তর অঞ্চলীয় কালো মসৃণ, রোলেটেড এবং নব্যুক্ত।
বাংলাদেশে মৃৎশিল্পের উৎপত্তি হাজার বছরের ও আগের মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকে। বগুড়ার মহাস্থানগড় খননের পর মাটির পাত্র সহ বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া যায়।এগুলো দেখে বোঝা যায় তখনকার মানুষ কত দক্ষ ছিল। প্রাপ্ত শ্রেণীবদ্ধ লোকশিল্পগুলি এখনও আধুনিক শিল্পকর্মের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। সভ্যতার পর এসেছে নানা রাজবংশ। প্রতিটি যুগে এসেছে নতুনত্ব। মুঘল আমলে এই শিল্প হয়েছিল আরও উন্নত। ব্রিটিশ আমলে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতার পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে আমাদের মৃৎশিল্প। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এই শিল্প এগিয়ে চলেছে । আজকের দিনে এই শিল্প শুধু ঐতিহ্য নয় । এটি হয়ে উঠেছে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই নান্দনিক শৈল্পিক তৈজসপত্র যারা তৈরী করে তাদেরকে বলে কুমোর। কুমোররা প্রধানত হিন্দু। তাদের অধিকাংশই একই উপাধি- 'পাল ' বহন করে। বেশিরভাগের জন্যই এটি তাদের পরিবারের দ্বারা পরিচালিত একটি ঐতিহ্যগত পেশা। তাদের অধিকাংশই পানি বহন ও রান্নার জন্য উপযোগী পাত্র তৈরি করে। অন্যরা পূজা এবং শোপিসের জন্য ভাস্কর্য তৈরি করে।
জমিদার আমলে কুমোররা জনপ্রিয় হয়েছিল। তারা দেবদেবীর মূর্তি, প্লেট এবং অন্যান্য নান্দনিক জিনিসপত্র তৈরির জন্য পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন। কখনও কখনও তারা নিজেরাই জমিদারের মূর্তি তৈরি করতেন। কিন্তু জমিদারি শেষ হওয়ার পর জীবিকার তাগিদে তারা প্রতিদিনের গৃহস্থালির জিনিসপত্র স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে শুরু করে। তারা জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা গোরুর গাড়ীর চাকাও তৈরি করে। ঢাকার ধামরাই মৃৎশিল্প বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রাম। ধামরাইয়ে বেশ কিছু মৃৎপাত্র গ্রাম রয়েছে, যেমন কাগজিপাড়া, শিমুলিয়া পাল পাড়া, নোটুন বন্ধর ইত্যাদি। এই গ্রামগুলি তাদের মৃৎশিল্পের দক্ষতা এবং বংশ পরম্পরায় পাল পরিবারের আবাসের জন্য সুপরিচিত।এখানে বেশিরভাগ কারিগর ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করে। তারা পণ্য তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। মাটির তৈজসপত্র তৈরীতে অনেক পরিশ্রম করতে হয় । মাটি সংগ্রহ, কাঁকর বাছাই করা, ছানা, পাতিলে কষ দেওয়া, শুকানো, ঘরে সংরক্ষণ করা সহ প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম। মাটি দিয়ে তৈরি নানা সামগ্রীর মধ্যে আছে হাড়িপাতিল, চাড়ি, কলস, খানদা, ফুলের টব, ফুলদানি, জীবজন্তু, পাখির অবয়ব, ঘটি-বাটি, ডাবর-মটকি, পুতুল, মাটির ব্যাংক, শোপিস,সানকি, পিঠা তৈরির ছাঁচ,সরা,কলস আর নানা রকম খেলনা। ঘর সাজাতে এখন বেশ জনপ্রিয় মাটির সামগ্রী। বৈশাখের আপ্যায়নে ঘরের ডেকোরেশনে মৃৎশিল্পের ছোঁয়ার সঙ্গে খাবারের টেবিলের তৈজস মাটির হলে খুব মানিয়ে যায় ।
স্বাস্থ্য সচেতনায় মাটির পাত্রের ব্যবহার :
আমাদের আধুনিক রান্নাঘরে বিভিন্ন ধরনের বাসন — অ্যালুমিনিয়াম, স্টেইনলেস স্টিল, তামা, নন-স্টিক, কাস্ট আয়রন, এমনকি মেলামাইন — ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এলুমিনিয়ামসহ অন্যান্য পাত্রের চেয়ে ক্লে-পট বা মাটির পাত্রে খাবার রান্না, ও সংরক্ষণের বহুমুখী উপকারিতার কথাই এখন বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মাটির এই প্রাকৃতিক পাত্রটি বেছে নেওয়া আমাদের জন্য একটা অনুপ্রেরণামূলক সিদ্ধান্ত হতে পারে, যা আমাদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে রক্ষা করবে। উদাহরণস্বরূপ, WHO-এর গবেষণা বলছে, ধাতব পাত্র থেকে ক্ষরণকৃত উপাদান শরীরে ক্ষতি করে।
যেমন-
১. অ্যালুমিনিয়াম:
অ্যালুমিনিয়াম হালকা এবং সস্তা, তবে এতে খাবার তৈরি করলে ধাতব কণা [Metal Leaching] শরীরে জমতে পারে। গবেষণা বলছে, এটি কিডনি ও স্নায়ুতে চাপ সৃষ্টি করে। কল্পনা করো, আপনার প্রতিদিনের খাবারে এমন ক্ষতিকর উপাদান মিশে যাচ্ছে—যা আপনার জীবনকে কষ্টময় করে তুলতে পারে। তার বদলে মাটির হাঁড়ি বেছে নিলে আপনার শরীর প্রকৃতির মতো স্বচ্ছ থাকবে।
২. স্টেইনলেস স্টিল:
স্টেইনলেস স্টিল নিরাপদ মনে হলেও, কিছু নিম্নমানের ব্র্যান্ডে সীসা বা নিকেল থাকে, যা হৃদয়ের জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। এতে স্বাদেও প্রাকৃতিক গভীরতা কম। যদি আপনি চান আপনার খাবারে প্রকৃতির ছোঁয়া, তাহলে এই ধাতুর বদলে মাটির পাত্র বেছে নিন—এটি আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে।
৩. তামা ও ব্রোঞ্জ:
তামা জল সংরক্ষণে ভালো, কিন্তু অ্যাসিডিক খাবার তৈরিতে এটি বিষক্রিয়া [Copper Toxicity] সৃষ্টি করতে পারে। ব্রোঞ্জেও এই সমস্যা দেখা যায়। এমন পাত্র যা আপনার খাবারকে বিষাক্ত করে—তা কেন ব্যবহার করবেন? মাটির হাঁড়ি আপনাকে প্রকৃতির নিরাপদ আশ্রয় দেবে, যা আপনার পরিবারকে সুস্থ রাখবে এবং আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে।
৪. কাস্ট আয়রন:
কাস্ট আয়রন রক্তস্বল্পতার জন্য উপযোগী, তবে অতিরিক্ত আয়রন হার্ট ও লিভারে ক্ষতি করতে পারে। এটি ভারী হওয়ায় সবার জন্য সুবিধাজনক নয়। যদি আপনি চান একটা সহজ এবং প্রকৃতিসম্মত সমাধান, তাহলে মাটির পাত্র আপনার জন্য আদর্শ—এটি আপনার রান্নাকে একটা আনন্দময় অভিজ্ঞতায় পরিণত করবে।
৫. নন-স্টিক:
নন-স্টিক সহজ হলেও উচ্চ তাপে টেফলন গলে বিষাক্ত গ্যাস [Toxic Fumes] ছাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এমন কৃত্রিম পাত্র যা আপনার খাবারকে অস্বাস্থ্যকর করে—তা ছেড়ে দিয়ে মাটির হাঁড়িতে ফিরে যান, যা আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে প্রকৃতির সাথে হাত মিলিয়ে জীবন যাপন করতে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, এ ধরনের পাত্র এড়িয়ে চলা উচিত।
৬. মেলামাইন:
মেলামাইন শুধু ঠান্ডা খাবারের জন্য নিরাপদ। গরম খাবারে ফর্মালডিহাইড ও মেলামিন কিডনি ও লিভারে ক্ষতি করে। এই প্লাস্টিকের বাসন আপনার জীবনে বিষ ঢোকায়, কিন্তু মাটির পাত্র আপনাকে প্রকৃতির পথ দেখাবে, যাতে আপনি স্বাস্থ্যকর খাবারে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেন।
স্বাদ: মাটির হাঁড়িতে খাবার তৈরি শুধু স্বাদে অসাধারণ নয়, এটি স্বাস্থ্য ও মনের জন্যও উপকারী।এই প্রাকৃতিক পাত্রের সুবিধা শুধু শরীরে নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। চলুন, এর গুণাগুণগুলো একটু দেখে নিই । এই গুণাবলি আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে এই পাত্রটি আপনার রান্নাঘরে নেওয়ার জন্য, যাতে আপনার জীবন আরও স্বাস্থ্যকর ও আনন্দময় হয়।
১. স্বাদে গভীরতা যোগ করে:
ধীরে ধীরে তাপ ছড়ানোর কারণে খাবারের প্রতিটি উপাদানের স্বাদ মিশে যায়। তেল কম লাগে, আর স্বাদে ফুটে ওঠে প্রাকৃতিক মাধুর্য। যেমন, ইলিশের ঝোলের সুগন্ধ সারা বাড়ি ভরিয়ে দেয়। কল্পনা করুন, আপনার পরিবারের সদস্যরা এই স্বাদে মুগ্ধ হয়ে উঠলে কত আনন্দ হবে—এটি আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে প্রতিদিন নতুন করে রান্না করতে।
২. প্রাকৃতিক খনিজ সরবরাহ:
এই পাত্র থেকে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ খাবারে মিশে যায়, যা রাসায়নিক ছাড়াই শরীরের জন্য উপকারী। এই খনিজগুলো আপনার শরীরকে শক্তিশালী করে তুলবে, যাতে আপনি প্রকৃতির মতো সবল হয়ে উঠেন এবং জীবনকে আরও উপভোগ করেন ।
৩. হজমে সহায়ক:
এর অ্যালকালাইন গুণ অম্লতা কমায়, পেট হালকা করে, এবং হজম সহজ করে। অম্বল বা গ্যাসের সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য এটি খুব কার্যকর। যদি আপনি এই সমস্যায় ভুগতে থাকেন, তাহলে এই পাত্রটি আপনার জন্য একটা অনুপ্রেরণা হবে—এটি আপনাকে সুস্থ পেটের সঙ্গে সকাল থেকে রাত অবধি সক্রিয় রাখবে।
৪. পরিবেশবান্ধব ও টেকসই:পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্য আজকের যুগে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের চারপাশে প্লাস্টিকের দূষণ বাড়ছে । এই সময়ে মাটির পণ্য হতে পারে ভালো সমাধান। কারণ
এই বাসন জৈব-বিয়োজ্য [Biodegradable], যা ব্যবহার শেষে প্রকৃতিতে মিশে যায়। মাটির পণ্য তৈরী হয় প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে । এতে নেই কোন রাসায়নিক পদার্থ। তাই এসব জিনিস ব্যবহার করা নিরাপদ। আর এসব জিনিস নষ্ট হওয়ার পরে মাটিতে মিশে যাওয়ার ফলে পরিবেশের কোন ক্ষতি হয় না। এছাড়া স্থানীয় কুমারদের হাতে তৈরি এই পাত্র তাদের জীবিকারও সমর্থন করে। কল্পনা করুন আপনার একটা ছোট সিদ্ধান্ত কতটা পরিবেশ রক্ষা করতে পারে—এটি আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে টেকসই জীবনযাপনের পথে। বিশ্ব পরিবেশ সংস্থার পরিবেশবান্ধব উপায় এই পাত্রকে সমর্থন করে। আজকাল অনেক মানুষ সচেতন হচ্ছেন পরিবেশ নিয়ে ।তারা প্লাস্টিকের বদলে ব্যবহার করছেন মাটির জিনিস। এই প্রবণতা বাড়ছে শহরেও।
৫. খাবার দীর্ঘক্ষণ উষ্ণ রাখে:
একবার গরম হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার গরম থাকে, ফ্রিজ বা মাইক্রোওয়েভের প্রয়োজন হয় না। এটি বিদ্যুৎ বাঁচায় এবং আপনার জীবনকে সহজ করে তুলবে, যাতে আপনি আরও সময় পান প্রকৃতির সঙ্গে কাটানোর।
৬. অসুখের ঝুঁকি হ্রাস করে:
গবেষণা অনুসারে, এই পাত্রে তৈরি খাবার কিডনি ও লিভারের সমস্যার ঝুঁকি ৮৫% কমায়। এই সুবিধা আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে স্বাস্থ্যকর জীবনের দিকে অগ্রসর হতে, যাতে আপনার জীবন দীর্ঘ এবং সুখময় হয়। এছাড়াও মাটির পাত্রে পানি রাখলে পানিতে হরেক রকমের খনিজ পদার্থ মেশে। ফলে শরীর পায় প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি (IJEAST) দ্বারা পরিচালিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করা পানিতে প্লাস্টিকের বোতলে সংরক্ষিত পানির তুলনায় গুণমান বজায় থাকে বেশি।
শিশুদের খেলনা : গ্রাম বাংলার মাটির খেলনা শিশুদের কাছে প্রিয় ছিল ।আগের দিনে গ্রামের বাচ্চারা এসব খেলনা নিয়ে খেলতো । এসব খেলনার মধ্যে ছিল - ঘোড়া , হাতি ,পুতুল, নানা রকম পাখী ইত্যাদি । মাটির খেলনা তৈরী করতেন গ্রামের কারিগররা । তারা বাচ্চাদের পছন্দের জিনিস বানাতেন। বাচ্চারা। এসব খেলনা দিয়ে খেলতে সারাদিন । এসব খলনা ছিল একদম নিরাপদ ভেঙ্গে গেলে ও কোন সমস্যা ছিল না । আজকাল প্লাস্টিকের খেলনা বেশি দেখা যায় ।কিন্ত মাটির খেলনার আলাদা আকর্ষণ আছে । এসব খেলনা বাচ্চাদের কল্পনা শক্তি বাড়ায় ।বাড়ায় তাদের সৃজনশীলতা । তাই এখনও অনেক বাবা মা বাচ্চাদের জন্য মাটির খেলনা কেনেন ।
গ্রামের মেলাতে পাওয়া যায় নানা রকম মাটির খেলনা ।
বাচ্চারা নিজেরাও বানাতে পারে সহজ খেলনা ।
মাটির খেলনা ভেঙ্গে গেলে মাটিতে মিশে যায় ।
এসব খেলনায় নেই কোন ক্ষতিকর রং ।
খেলতে খেলতে বাচ্চারা শেখে শিল্প সম্পর্কে ।
তাই আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। বাচ্চাদের হাতে মোবাইল দেওয়ার বদলে তাদের হাতে তুলে দেই মাটির খেলনা । ঐতিহ্য নিয়ে বেড়ে উঠতে বাচ্চাদের সাহায্য করি । এবং আমরাও নিজেদের স্বাস্থ্য রক্ষায় , পরিবেশ রক্ষায় মাটির তৈজস পত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি করি । ধারণ করতে শিখি নিজেদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি কে । বৈশাখের এই আনন্দের দিনে এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন